ডেস্ক রিপোর্ট
রাতের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসছিল ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার। কেউ শুনেছেন কান্নার শব্দ, কেউ আবার দাবি করেছেন, অসুস্থ মনির ফকির প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রাতেই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর খবর আসে তার বাড়ি থেকে। কী ঘটেছিল ওই রাতে, কীভাবে মৃত্যু হলো ৫০ বছর বয়সী মনির ফকিরের- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের গোয়ালবাথান গ্রামের এ ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের কেউ কেউ মনির ফকিরের স্ত্রী নাসিমা বেগম ও মেয়ে মারিয়ার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেয়ে মারিয়া। তার দাবি, ময়নাতদন্ত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসুক।
রোববার দিবাগত রাত (২৫ অক্টোবর) রাত ১২টার দিকে মনির ফকিরের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তিনি ওই গ্রামের মৃত আফসার ফকিরের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোকজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে মনির ফকিরের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ। তার মৃত্যু স্বাভাবিক, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার দিবাগত রাতে মনির ফকিরের বাড়ি থেকে চিৎকার ও কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পান প্রতিবেশীরা। কয়েকজন বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টিকে পারিবারিক ব্যাপার বলে তাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। পরে রাত ১২টার দিকে মনির ফকিরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেশী জাকিয়া বেগম জানান, অসুস্থ হওয়ার পর থেকে মনির ফকিরের সঙ্গে তার স্ত্রী ও মেয়ের প্রায়ই ঝগড়া হতো। ঘটনার রাতেও তাকে মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জাকিয়া বেগম বলেন, মারধরের পর মনির ফকির পাশের বাড়িতে গিয়ে বাঁচানোর আকুতি জানান। পরে তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে যান। এরপর ওই বাড়ি থেকে আবারও চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যুর খবর পান তারা।
স্থানীয় এক যুবক জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা তিনবার জোরে চিৎকারের শব্দ শুনতে পান। পরে কয়েকজন প্রতিবেশী খোঁজ নিতে গেলেও প্রথমে কোনো সাড়া পাননি। কিছুক্ষণ পর পরিবারের পক্ষ থেকে একজনকে ডেকে মনির ফকিরের মৃত্যুর খবর জানানো হয়।
আরেক প্রতিবেশী নারীর দাবি, ঘটনার রাতে মনির ফকির তাদের বাড়ির সামনে গিয়ে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকেন। এ সময় তিনি স্ত্রী ও মেয়ের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তুলে বাঁচানোর আকুতি জানান। পরে তাকে পাশের বাড়ির সিঁড়িতে বসানো হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে যান। এরপর আবারও ‘আমাকে বাঁচাও’ বলে চিৎকারের শব্দ শুনতে পান তারা।
মনির ফকিরের স্ত্রী নাসিমা বেগম জানান, তার স্বামী আগে খুলনায় গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। চাকরিরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে স্ট্রোক করেন তিনি। পরে চিকিৎসা করানো হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর কাজে ফিরতে পারেননি।
এরপর পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের খরচ চালাতে ধারদেনাসহ বিভিন্নভাবে অর্থের সংস্থান করতে হতো বলে জানান নাসিমা বেগম। সংসারের নানা বিষয় নিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের ঝগড়াঝাঁটি হতো বলেও স্বীকার করেন তিনি।
তবে স্বামীর মৃত্যুর পেছনে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে নাসিমা বেগম বলেন, স্ট্রোকের কারণেই তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে।
মনির ফকিরের বোন জানান, রাত প্রায় তিনটার দিকে ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়িতে এসে তার মরদেহ খাটের ওপর দেখতে পান। এ সময় তাদের মা পাশে বসে ছিলেন। প্রায় সাত মাস আগে স্ট্রোক করার পর থেকেই ভাইয়ের সংসারে নানা সমস্যা চলছিল।
বাবার মৃত্যুর ঘটনায় ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেয়ে মারিয়া। তিনি বলেন, তার বাবার ময়নাতদন্ত হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পুলিশ তদন্ত করবে এবং আইন অনুযায়ী বিষয়টির বিচার হবে।
তিনি আরও বলেন, গত সাত থেকে আট মাস ধরে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাবার সঙ্গে সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো বলেও স্বীকার করেন মারিয়া। তবে পারিবারিক কলহের কারণে বাবাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ তিনি মানতে নারাজ।
একদিকে মৃত্যুর আগে চিৎকার শোনার দাবি প্রতিবেশীদের, অন্যদিকে স্ট্রোকজনিত অসুস্থতাকে মৃত্যুর কারণ বলছে পরিবার। ফলে মনির ফকিরের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন নির্ভর করছে তদন্তের ফলাফলের ওপর।
বরিশাল বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মনির ফকিরের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
